বটবাহিনীর দাপটে চাপে জনমত, নতুন ডিজিটাল হুমকির মুখে বাংলাদেশ

0 comments

অর্থনীতি বার্তা ডেস্ক

বাংলাদেশের জন্য বর্তমানে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি আরেকটি নীরব সংকট দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বট (Bot) ও সংঘবদ্ধ ভুয়া অ্যাকাউন্টের ব্যবহার এখন জনমত প্রভাবিত করা, বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং ডিজিটাল পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দাবি করেন, দেশের সাইবার জগতের মোট ট্রাফিকের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই বট বা কৃত্রিম কার্যকলাপ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনলাইনের প্রতিক্রিয়া ও জনমত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অর্গানিক এবং নন-অর্গানিক ট্রাফিক আলাদা করতে না পারলে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

বট কী এবং কীভাবে কাজ করে

‘বট’ শব্দটি এসেছে ‘রোবট’ থেকে। এটি এমন একটি সফটওয়্যার প্রোগ্রাম, যা মানুষের মতো আচরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পোস্ট, মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। যখন অসংখ্য ভুয়া বা নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টকে একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন সেটিকে সাধারণভাবে বটবাহিনী বা বট আর্মি বলা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বট সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় বা অটোমেটেড বট, যা নির্দিষ্ট কী-ওয়ার্ড বা নির্দেশনা অনুযায়ী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায়। দ্বিতীয়টি হলো হিউম্যান ট্রল আর্মি, যেখানে বাস্তব মানুষ একাধিক ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে সমন্বিতভাবে প্রচারণা চালায়।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বট প্রযুক্তির উন্নতির ফলে এসব অ্যাকাউন্ট শুধু কপি-পেস্ট মন্তব্যই করে না, বরং মানুষের মতো ভাষা ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে সক্ষম।

জনমত প্রভাবিত করার নতুন কৌশল

বটবাহিনীর প্রধান উদ্দেশ্য হলো কোনো ঘটনা বা ইস্যুকে ঘিরে কৃত্রিম জনমত তৈরি করা। শত শত বা হাজার হাজার অভিন্ন মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া ও শেয়ারের মাধ্যমে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীর কাছে মনে হয় নির্দিষ্ট মতামতটিই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মত।

এছাড়া ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার, গুজব ছড়ানো, সামাজিক মাধ্যমে গণহারে রিপোর্ট করে অ্যাকাউন্ট বা পেজ বন্ধ করার চেষ্টাও এ ধরনের কার্যক্রমের অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কীভাবে শনাক্ত করা যায়

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, কোনো পোস্ট প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অস্বাভাবিক সংখ্যক মন্তব্য আসা, বহু অ্যাকাউন্ট থেকে একই ভাষায় হুবহু মন্তব্য করা, ব্যক্তিগত তথ্যবিহীন প্রোফাইল, বাস্তব জীবনের কার্যক্রমের অভাব এবং শুধুমাত্র শেয়ারভিত্তিক টাইমলাইন—এসবই সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হতে পারে। তবে শুধুমাত্র এসব লক্ষণ দেখেই কোনো অ্যাকাউন্টকে নিশ্চিতভাবে বট বলা যায় না; প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণও প্রয়োজন।

গণতন্ত্র ও সমাজের জন্য ঝুঁকি

বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম জনমত তৈরির মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক মেরুকরণ, বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের বিস্তার এবং ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

মনোবিজ্ঞানে একে ‘ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট’ বলা হয়, যেখানে মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ মনে হওয়া মতামতের সঙ্গে সহজেই একাত্ম হয়ে যায়। রাজনৈতিক যোগাযোগে এ ধরনের কৃত্রিম জনমত তৈরির কৌশলকে ‘অ্যাস্ট্রোটার্ফিং’ নামেও অভিহিত করা হয়।

করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলা ভাষা ও স্থানীয় বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি সংঘবদ্ধ ডিজিটাল অপপ্রচার মোকাবিলায় কার্যকর আইনগত কাঠামো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

একই সঙ্গে স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ সম্পর্কে শিক্ষা সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্য যাচাই জরুরি

তবে বটবাহিনীর প্রভাব নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান ও দাবিগুলো স্বাধীন গবেষণা ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। কারণ অনলাইনে অস্বাভাবিক কার্যকলাপের সবটিই বটের মাধ্যমে পরিচালিত হয় না; প্রকৃত ব্যবহারকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণও অনেক সময় একই ধরনের চিত্র তৈরি করতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ ব্যবহারকারীদের সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে একটি নিরাপদ ও তথ্যনির্ভর ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার প্রধান উপায়।

You may also like

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়:
৪৩/সি, মায়াকানন, ঢাকা – ১২১৪

ই-মেইল
editor.arthonitibarta@gmail.com
news.arthonitibarta@gmail.com

ওয়েবসাইট
www.arthonitibarta.com

Edtior's Picks

Latest Articles

Developed BY  Netfie.com