অর্থনীতি বার্তা ডেস্ক
মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে রাখা— এসব প্রত্যাশা নিয়েই সাধারণ মানুষ প্রতি বছর জাতীয় বাজেটের দিকে তাকিয়ে থাকে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করেছে সরকার।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এটি তার প্রথম বাজেট, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকেই বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
বাজেট উপস্থাপনের আগে প্রধান উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজেট ঘোষণা করা হয়। অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতেই মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন এবং অর্থনীতির বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি সমন্বিত রূপরেখা তুলে ধরেন।
নিত্যপণ্যে স্বস্তির বার্তা
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য। এ লক্ষ্যে সরকার ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎস কর কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।
কৃষকের জন্য কৃষক কার্ড
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষকদের জন্য বাজেটে বড় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃষক কার্ড কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫ হাজার কৃষকের মধ্যে কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় কৃষকরা বছরে একবার সরাসরি আর্থিক সহায়তা পাবেন। মোট সহায়তার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এছাড়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষুদ্র কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগও কৃষকদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য
বর্তমানে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। নতুন বাজেটে তা কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
শিক্ষায় নতুন দিগন্ত
বাজেটে শিক্ষা খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ধাপে ধাপে কারিগরি শিক্ষা চালুর উদ্যোগ, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শিক্ষা এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
স্বাস্থ্যসেবায় বাড়তি সহায়তা
স্বাস্থ্য খাতে ওষুধ শিল্পের কাঁচামালে কর সুবিধা, কিডনি ও ক্যানসার রোগীদের জন্য সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা ব্যয় কমানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে চিকিৎসাসেবার ব্যয় কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি ও এআই খাতে গুরুত্ব
ডিজিটাল অর্থনীতি, সৃজনশীল শিল্প এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের সুযোগ সৃষ্টি করাই সরকারের লক্ষ্য বলে বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মসংস্থানে বড় পরিকল্পনা
‘করব কাজ, গড়ব দেশ’ স্লোগানকে সামনে রেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে একাধিক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু, এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ ব্যবস্থা চালু এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রবীণদের জন্য সুখবর
৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের জন্য বিনামূল্যে রেল ভ্রমণ এবং মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড়ের প্রস্তাব সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
ব্যবসা ও বিনিয়োগে প্রণোদনা
ব্যবসা ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ৬৯টি পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো হয়েছে। পাশাপাশি ৯টি পণ্যের সম্পূরক শুল্ক এবং ১১৩টি পণ্যের নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্যবসায়ী মহলের মতে, এসব পদক্ষেপ বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও শিল্পায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটটি একদিকে যেমন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কৃষি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে জোর দিয়েছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ঘোষিত কর্মসূচিগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন।
