অর্থনীতি বার্তা ডেস্ক
জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দেশীয় শিল্প সুরক্ষা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, শিল্পায়নের গতি ত্বরান্বিত করা, অঞ্চলভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজেটে ১৯টি সম্ভাবনাময় খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য ‘ইনভেস্টমেন্ট হিট ম্যাপ’ প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি পটুয়াখালী ও যশোরে নতুন রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে, যেখানে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, চাঁদপুর ও কুষ্টিয়ায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সম্ভাবনাময় দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) এবং ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য আটটি সম্ভাবনাময় খাতকে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত পণ্য খালাস সুবিধা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সাশ্রয়ী ইলেকট্রিক বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল ও স্কুটার উৎপাদনে নীতিগত সহায়তার কথাও বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ-২০২৬’ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।
এই তহবিলের আওতায় পাঁচটি প্রধান খাতে অর্থায়ন করা হবে। এর মধ্যে বন্ধ শিল্পপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু ও সেবা খাতের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা, কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১০ হাজার কোটি টাকা, সিএমএসএমই খাতে ৫ হাজার কোটি টাকা, রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গকে কৃষি হাব হিসেবে গড়ে তুলতে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সরকারের আশা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরে আসবে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের বিকাশে পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় সরকারি সংস্থার মাধ্যমে সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ও সুরক্ষায় বাজেটে বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক ও কর কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক ওভেন ও মাইক্রোওয়েভ ওভেন উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল ফ্লোট গ্লাস আমদানির ওপর বিদ্যমান ৪৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এলপিজি সিলিন্ডার, অটো ট্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধা ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে কিছু পণ্যের আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি করা হয়েছে। ১ কেভিএ পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সফরমার আমদানির শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
স্থানীয় ওয়াশিং মেশিন শিল্পকে সুরক্ষা দিতে আমদানিকৃত সব ধরনের হাউসহোল্ড ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এছাড়া কাগজ, মেইজ স্টার্চ, কোল্ড-রোল্ড কয়েল ও শিটসহ বিভিন্ন খাতে দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে রেগুলেটরি শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্প সুরক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রস্তাবিত বাজেট দেশের উৎপাদনমুখী অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
