অর্থনীতি বার্তা ডেস্ক
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের ব্যাংকিং খাত আরও বড় সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় দেশের অর্থনীতি বর্তমানে চাপে রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আর্থিক খাতের সংস্কার ও বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর বাংলামোটরে উন্নয়ন সমন্বয়ের খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত ‘বাজেট ২০২৬-২৭ ও বাংলাদেশের আর্থিক খাত: নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক প্রাক-বাজেট সেমিনারে বক্তারা এসব মন্তব্য করেন।
সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে বৈদেশিক ও দেশীয় বিনিয়োগের গতি কমে গেছে। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, এলসি খোলার হার এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও নিম্নমুখী, যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত নয়।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতকে পুনরুদ্ধার করতে হলে রিফাইন্যান্সিংয়ের ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে দীর্ঘমেয়াদে শুধু ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন কাঠামো টেকসই নয়। এজন্য আর্থিক খাতকে আরও বহুমুখী ও শক্তিশালী করতে হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সোহেল আর কে হোসাইন বলেন, দেশের ১২টি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সুদের হার বৃদ্ধি অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে সরকারকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর। তিনি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের দুর্বলতা অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
প্যানেল আলোচক ড. শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বেসরকারি খাতকে নেতৃত্বের ভূমিকা নিতে হবে। সব ধরনের অর্থায়নের দায়িত্ব শুধু বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর না দিয়ে বিকল্প আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকার কঠোর অবস্থান নিলে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে।
অন্যদিকে ড. রুমানা হক বলেন, করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ সুবিধা সম্প্রসারণে ব্যাংকগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন।
খোন্দকার সাখাওয়াত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বিভিন্ন শিক্ষার্থী, গবেষক ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উন্মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কার্যকর সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
