অর্থনীতি বার্তা ডেস্ক
দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এবং ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ আরও সহজ ও বিনিয়োগবান্ধব করতে সরকার ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বুধবার (১০ জুন) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ব্যবসার প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বিভিন্ন নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করছে। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
তিনি জানান, আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দপ্তর থেকে আমদানি ও রপ্তানি নিবন্ধন এখন অনলাইনের মাধ্যমে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রদান করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে রপ্তানি নীতি হালনাগাদ করা হয়েছে এবং আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য অশুল্ক বাধা কমানো, আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং মূল্য পরিশোধ ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতিমালা অনুসারে বাণিজ্য সহজীকরণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।
একীভূত হবে বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট সংস্থা
বিনিয়োগকারীদের জন্য সেবা সহজ করতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ অথরিটি (পিপিপিএ) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষকে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগকারীরা একটি একক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। ফলে নীতিগত অসামঞ্জস্য কমবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।
বিনিয়োগকারীদের সমস্যা সমাধানে নিয়মিত সমন্বয়
প্রধানমন্ত্রী জানান, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক জটিলতা দূর করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিডা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মধ্যে মাসিক সভার মাধ্যমে কর-সংক্রান্ত সমস্যা ও নীতিগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং শিল্পখাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় ও পরামর্শ সভা আয়োজন করা হচ্ছে।
মূলধন প্রত্যাবর্তন সহজ হবে
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য মূলধন ও মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার (Capital Repatriation) প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ব্যবসা বিক্রি, হস্তান্তর বা বন্ধের পর বিদেশে অর্থ পাঠাতে অনেক বিনিয়োগকারী জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার সম্মুখীন হন। এ সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কমিটি সংস্কার প্রস্তাব প্রস্তুত করেছে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
চালু হয়েছে ‘বাংলাবিজ’ প্ল্যাটফর্ম
লাইসেন্সিং ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার একটি সমন্বিত ডিজিটাল সিঙ্গেল-উইন্ডো প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-এর সহযোগিতায় ‘বাংলাবিজ’ প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে। এর মাধ্যমে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন সরকারি সেবা, নিবন্ধন, অনুমোদন ও লাইসেন্স সংক্রান্ত তথ্য এক জায়গা থেকেই জানতে এবং আবেদন করতে পারবেন।
তিনি বলেন, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া কমবে, শতভাগ অনলাইনভিত্তিক সেবা নিশ্চিত হবে এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সেবা প্রদান করা সম্ভব হবে।
বন্দর ও অবকাঠামো উন্নয়নে জোর
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। লজিস্টিক ব্যবস্থা সহজীকরণ, বন্দর আধুনিকায়ন এবং নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল দ্রুত কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, লালদিয়া টার্মিনাল চলতি বছর চালুর প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজও অগ্রসর হচ্ছে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে বড় জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে ভিড়তে পারবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, সরকারের এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে নতুন গতি সঞ্চার হবে।
