অনলাইন ডেস্ক | অর্থনীতি বার্তা
লালমনিরহাটে আলু চাষ করে আবারও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে আলুর দাম কম থাকায় চাষিদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। জেলার কৃষি অর্থনীতিতে আলু একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল হলেও সাম্প্রতিক সময়ে তা চাষিদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর তীরবর্তী বেলে দোঁয়াশ মাটি আলু চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় প্রতিবছর জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় আলু আবাদ করা হয়। অনুকূল আবহাওয়া ও মাটির গুণাগুণের কারণে প্রতি মৌসুমেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। তবে টানা তিন বছর ধরে লোকসানের মুখে পড়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলার আলু চাষিরা।
চাষিরা জানান, চলতি মৌসুমে আলু চাষের শুরুতেই সার ও কীটনাশকের তীব্র সংকট দেখা দেয়। এতে বাধ্য হয়ে বেশি দামে সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ কিনতে হয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। অথচ বাজারে আলুর দাম ৮ থেকে ১০ টাকার মধ্যে থাকায় চাষিরা তাদের উৎপাদন খরচের অর্ধেকও তুলতে পারছেন না।
কৃষকদের হিসাবে, উৎপাদন খরচ এবং হিমাগারে সংরক্ষণ ব্যয় মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ টাকা। কিন্তু বাজারে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।
লালমনিরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জেলার পাঁচটি উপজেলায় চলতি মৌসুমে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে। তবে কৃষকের আগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৭ হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার কারণে উৎপাদনও হয়েছে সন্তোষজনক।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং সময়মতো বীজ ও সার সরবরাহ না থাকায় তারা বারবার ক্ষতির মুখে পড়ছেন। কমলাবাড়ি এলাকার কৃষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, “চড়া দামে সার কিনে আলু চাষ করেছি, কিন্তু বাজারে দাম এত কম যে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এভাবে আর কতবার লোকসান গুনতে হবে, তা বুঝতে পারছি না। সরকারের তেমন কোনো নজরও দেখছি না।”
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. শাইখুল আরেফিন জানান, অনেক কৃষক লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি জমিতে আলু চাষ করেছেন। তবে উৎপাদন খরচ বেশি এবং বাজারে দাম কম থাকায় প্রতি কেজি আলুতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। তিনি বলেন, এই সমস্যা সমাধানে আলুর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো এবং আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা জরুরি।
কৃষকেরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে ধারাবাহিক লোকসান চলতে থাকলে তারা ভবিষ্যতে আলু চাষ ছেড়ে তামাক বা অন্যান্য লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। এতে একদিকে কৃষকের আয়ের উৎস কমে যাবে, অন্যদিকে দেশের কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, কৃষি উপকরণের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং আলু প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে আগামী মৌসুমে আলু চাষে আগ্রহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
