অর্থনীতি বার্তা ডেস্ক
আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে ভ্যাট ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার আনতে যাচ্ছে সরকার। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং করের আওতা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে দেশের প্রায় সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন বাজেটে এমন কিছু শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে, যার ফলে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ভ্যাট নিবন্ধন ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে না। ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ গ্রহণ, ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বা নবায়ন, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ গ্রহণ, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসে মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, ট্রেড বডির সদস্যপদ গ্রহণ ও প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।
বর্তমানে সরকারি হিসাব অনুযায়ী দেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক কোটি ১৭ লাখের বেশি। তবে ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার। এর মধ্যে নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন জমা দেয় পাঁচ লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান। ফলে বিপুলসংখ্যক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনও ভ্যাট ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মনে করছে, নতুন বিধান কার্যকর হলে অন্তত ২০ লাখ নতুন প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় আসবে। এতে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক খাত আরও শক্তিশালী হবে।
তবে ব্যবসায়ী নেতারা এ উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ব্যবসা সহজীকরণের পরিবর্তে নতুন শর্ত আরোপ করলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বাড়তি চাপের মুখে পড়তে পারেন। তারা ভ্যাট নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম সম্পূর্ণ অনলাইন ও হয়রানিমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো মদের ওপর লিটারপ্রতি ৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপের চিন্তা করছে সরকার। এতে রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি এ ধরনের পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বর্ণালংকার খাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে শতকরা হারে ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরি স্বর্ণালংকার ও প্রতি ক্যারেট ডায়মন্ডে নির্দিষ্ট হারে ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এতে রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।
নারীদের ব্যবহৃত কিছু প্রসাধনী সামগ্রীর ওপর সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তাবও রয়েছে। ফলে লিপস্টিক, আই মেকআপ, পাউডারসহ কিছু পণ্যের দাম কমতে পারে।
মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের জন্যও সুখবর থাকতে পারে। বর্তমানে নতুন সিম বা ই-সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার সুনির্দিষ্ট ভ্যাট প্রত্যাহার করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট নির্ধারণের চিন্তা করা হচ্ছে। এতে নতুন গ্রাহকদের খরচ কমবে।
এ ছাড়া ব্যাংকে আমানতের ওপর আবগারি শুল্কের সীমাও বাড়ানো হতে পারে। বর্তমানে তিন লাখ টাকার বেশি জমা থাকলে আবগারি শুল্ক কাটা হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এ সীমা পাঁচ লাখ টাকায় উন্নীত করা হতে পারে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীদের জন্য স্বস্তি বয়ে আনবে।
চলতি অর্থবছরে ভ্যাট খাতে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৬ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। তবে আগামী অর্থবছরে সেই লক্ষ্য বাড়িয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণ এবং নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার পদক্ষেপকে রাজস্ব আহরণের অন্যতম প্রধান কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।
