রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন, এনবিআর সংস্কারের তাগিদ

0 comments

অর্থনীতি বার্তা ডেস্ক

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ।

শনিবার (২০ জুন) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত এক ভার্চ্যুয়াল পোস্ট-বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, শুধু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর চাপ বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না। বরং এনবিআর-বহির্ভূত রাজস্ব উৎস এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় বৃদ্ধির দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

“এটি একটি সাধারণ অঙ্ক, কিন্তু বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ”

ড. মজিদ বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয় বাজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এবং বাজেট ঘাটতি প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।

তার ভাষায়,

“এটি একটি সিম্পল ম্যাথ। কিন্তু এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা কতটা যথার্থ, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নযোগ্যতার ওপর।”

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে প্রায় ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা আসার কথা এনবিআরের কর আদায় থেকে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যানের মতে, শুধুমাত্র কর আদায়ের ওপর নির্ভর না করে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ও মুনাফা বৃদ্ধির দিকেও নজর দেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ রেলওয়ে কিংবা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর মতো প্রতিষ্ঠানে সরকারের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু এসব খাত থেকে প্রত্যাশিত আর্থিক রিটার্ন পাওয়া যাচ্ছে না।

তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো না হলে মনে হবে তাদের কার্যত “ওয়াকওভার” দেওয়া হচ্ছে।

‘অর্থ বিধি’ প্রণয়নে অংশীজনদের সম্পৃক্ততার দাবি

বাজেট বাস্তবায়নের অন্যতম সীমাবদ্ধতা হিসেবে তিনি ‘অর্থ বিধি’ বা ফাইন্যান্স বিল প্রণয়নের বর্তমান প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেন।

ড. মজিদ বলেন, অর্থ বিধি তৈরির সময় ব্যবসায়ী সংগঠন, বেসরকারি খাত এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে যথেষ্ট আলোচনা হয় না। ফলে বাজেটে কীভাবে রাজস্ব বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকে না।

“এনবিআরকে আর জিজ্ঞেস করা হয় না কত আদায় সম্ভব”

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ২০১৫ সালের পর থেকে এনবিআরকে বাস্তব সক্ষমতা অনুযায়ী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।

তার মতে, আগে এনবিআর নিজেই খাতভিত্তিক হিসাব দিয়ে জানাতো কোথা থেকে কত রাজস্ব আদায় সম্ভব। এখন ব্যয়ের বাজেট আগে নির্ধারণ করা হয়, এরপর সেই অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য এনবিআরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।

ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংস্কারের ওপর গুরুত্ব

রাজস্ব আহরণ অর্থনীতির সামগ্রিক অবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার শক্তিশালী না হলে কর আদায়ও বাড়ানো কঠিন হবে।

বর্তমানে সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংকঋণ গ্রহণের কারণে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সংকুচিত হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এনবিআরের নীতি ও বাস্তবায়ন বিভাগ পৃথক করার সুপারিশ

ড. মজিদ দীর্ঘদিনের একটি সংস্কার প্রস্তাব পুনরায় তুলে ধরে বলেন, এনবিআরের নীতি প্রণয়ন (Policy Making) এবং বাস্তবায়ন (Implementation) বিভাগ আলাদা করা প্রয়োজন।

তার মতে, বর্তমানে এনবিআর নিজেই করনীতি তৈরি করে এবং নিজেই তা বাস্তবায়ন করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে আদর্শ পদ্ধতি নয়।

তিনি বলেন, করনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এফবিসিসিআই-সহ ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর মতামত আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

প্যানেল আলোচনায় আরও অংশ নেন:

  • ড. এম. এ. সাত্তার মণ্ডল
  • ড. মোহাম্মদ মইনুল ইসলাম
  • মো. ফজলুল হক
  • ফারাহ কবির

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য শুধু করের হার বৃদ্ধি নয়, বরং করের আওতা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটালাইজেশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

You may also like

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়:
৪৩/সি, মায়াকানন, ঢাকা – ১২১৪

ই-মেইল
editor.arthonitibarta@gmail.com
news.arthonitibarta@gmail.com

ওয়েবসাইট
www.arthonitibarta.com

Edtior's Picks

Latest Articles

Developed BY  Netfie.com