অর্থনীতি বার্তা | অনলাইন ডেস্ক
চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া থানার সৈয়দ নগর, পারুয়া গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে ১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ জন্ম নেন মো. আরফাত ছিদ্দিকী। বাইরে থেকে এটি একটি সাধারণ জন্মকথা মনে হলেও, তার জীবন শুরু থেকেই ছিল অসাধারণ এক সংগ্রামের অধ্যায়।
শৈশবেই তার জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। খুব অল্প বয়সেই তিনি মাকে হারান। মায়ের স্নেহ, আদর ও নিরাপত্তা—যা একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়—তা থেকে তিনি চিরতরে বঞ্চিত হন। অন্যদিকে তার বাবা ছিলেন প্রবাসে, জীবিকার তাগিদে দূরে থাকা বাবার উপস্থিতিও তিনি পাননি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোতে। ফলে ছোটবেলা থেকেই তিনি বড় হয়েছেন এক কঠিন একাকীত্ব, অনিশ্চয়তা এবং দায়িত্বের বোঝা নিয়ে। কিন্তু জীবন তাকে থামতে শেখায়নি।
মাত্র ১২ বছর বয়স থেকেই তিনি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা শুরু করেন। যেখানে অন্য শিশুরা পড়াশোনা ও খেলাধুলায় ব্যস্ত, সেখানে আরফাত ছিদ্দিকী জীবন-সংগ্রামের বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করছিলেন। ছোট ছোট কাজ, পরিশ্রম এবং সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজের ভেতরে উদ্যোক্তার মানসিকতা গড়ে তোলেন।
এই সময়টাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি—যেখান থেকে তিনি শিখেছেন “পরিশ্রমই একমাত্র পরিচয় তৈরি করে।”
২০১৭: ঘুরে দাঁড়ানোর প্রথম আলো
দীর্ঘ পরিশ্রম ও অভিজ্ঞতার পর ২০১৭ সালের দিকে তার জীবনে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসে। ব্যবসায়িক দিক থেকে তিনি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেন। স্বপ্ন দেখা আবার নতুন করে শুরু হয়—নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার, পরিবার ও সমাজে একটি জায়গা তৈরি করার।
কিন্তু জীবন এখানে থেমে থাকেনি।
করোনা মহামারি: ভাঙনের সময়
বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি শুধু অর্থনীতি নয়, অনেক মানুষের স্বপ্নকেও ভেঙে দেয়। আরফাত ছিদ্দিকীর ব্যবসাও সেই ধাক্কায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এক মুহূর্তে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়।
এই সময়েই ঘটে তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি—একটি প্রতারণামূলক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার কারণে তাকে চট্টগ্রাম কারাগারে সময় কাটাতে হয়। এই সময়টি তার জীবনের জন্য ছিল গভীর আত্ম-অনুধাবনের, কষ্টের এবং পরিবর্তনের এক বাস্তব স্কুল।
কারাগারের চার দেয়াল তাকে ভেঙে দেয়নি, বরং ভেতর থেকে নতুন করে গড়ে তুলেছে।
২০২১: নতুন জন্মের শুরু
কারাগার থেকে মুক্তির পর ২০২১ সাল থেকে তিনি আবার নতুন করে জীবন শুরু করেন। এইবার তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন—আরও বাস্তব, আরও অভিজ্ঞ এবং আরও দৃঢ়।
তিনি বুঝতে পারেন—জীবনে ব্যর্থতা শেষ নয়, বরং এটি নতুন শুরু করার একটি সুযোগ।
হারানো সময়, ভুল সিদ্ধান্ত এবং কঠিন অভিজ্ঞতাকে তিনি শক্তিতে রূপান্তর করেন। আবারও শুরু হয় তার উদ্যোক্তা জীবনের নতুন অধ্যায়।
একাকীত্বই ছিল তার সবচেয়ে বড় শিক্ষক
তার জীবনের আরেকটি বাস্তবতা ছিল—সম্পূর্ণ একাকীত্ব। ছোটবেলা থেকে কোনো আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বা প্রতিবেশীর দৃঢ় সহায়তা তিনি পাননি। জীবন তাকে শিখিয়েছে নিজের উপর ভরসা করতে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে এবং নিজের সমস্যার সমাধান নিজেকেই খুঁজে নিতে।
এই একাকীত্বই তাকে শক্ত করেছে, পরিণত করেছে এবং বাস্তবতার সাথে লড়াই করতে শিখিয়েছে।
বর্তমান পথচলা: ইছামতি গ্রুপ
বর্তমানে মো. আরফাত ছিদ্দিকী ইছামতি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বিভিন্ন ব্যবসায়িক খাতে কাজ করছেন। কৃষি, শিল্প, খাদ্য, তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক উন্নয়নসহ নানা ক্ষেত্রে তিনি কাজ করার চেষ্টা করছেন।
তার লক্ষ্য শুধু ব্যবসা নয়—বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি, তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।
তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা
তার জীবনের গল্প থেকে তরুণ প্রজন্ম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে—
- জীবন কখনো সহজভাবে আসে না, কিন্তু পরিশ্রম সবকিছুকে বদলে দিতে পারে
- ব্যর্থতা শেষ নয়, এটি নতুন শুরু করার সুযোগ
- একাকীত্ব দুর্বলতা নয়, এটি শক্তির ভিত্তি হতে পারে
- প্রতিকূলতা মানুষকে ভাঙতেও পারে, আবার গড়তেও পারে
- সবচেয়ে বড় শিক্ষক হলো অভিজ্ঞতা ও সময়
মো. আরফাত ছিদ্দিকীর জীবন তাই শুধু একজন উদ্যোক্তার গল্প নয়—এটি একজন মানুষের ভাঙা-গড়া, হেরে গিয়ে আবার জিতে ওঠার বাস্তব ইতিহাস।
তার গল্প তরুণ প্রজন্মকে একটি বার্তা দেয়—
“তুমি কোথা থেকে শুরু করছো তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, তুমি কোথায় থেমে যাও সেটাই আসল পরিচয়।”
