অর্থনীতি বার্তা ডেস্ক
একসময় মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরব ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের আধিপত্যকে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের এই উত্থান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা, শেল তেল বিপ্লব এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
কয়েক দশক আগেও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরশীলতা ছিল মার্কিন অর্থনীতির অন্যতম বড় দুর্বলতা। ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলকে সমর্থনের কারণে ওপেকের আরোপিত তেল নিষেধাজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছিল। তবে ২০১০ সালের পর থেকে শেল তেল ও গ্যাস উত্তোলনে বিপ্লব ঘটায় দেশটির জ্বালানি খাতে আমূল পরিবর্তন আসে।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংঘাতও যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানকে ত্বরান্বিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার কারণে সৌদি আরবের তেল রফতানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একই সময়ে ইউক্রেনের ড্রোন হামলা এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার জ্বালানি রফতানিও চাপে পড়েছে।
জাহাজ চলাচলের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্যের রফতানি দৈনিক ১ কোটি ৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে টানা তিন মাস বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারকের অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি।
একই সময়ে রাশিয়ার দৈনিক তেল রফতানি ছিল প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল এবং সৌদি আরবের ছিল ৫৯ লাখ ব্যারেল। অথচ ২০২৫ সালেও সৌদি আরব দৈনিক গড়ে ৮১ লাখ ব্যারেল রফতানি করে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের রফতানি ছিল ৬৬ লাখ ব্যারেল এবং রাশিয়ার ছিল ৫৮ লাখ ব্যারেল।
তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ও তরল জ্বালানি উৎপাদন প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক ২ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে। বিপরীতে ওপেকের উৎপাদন কোটা এবং বাজার পরিস্থিতির কারণে সৌদি আরবের উৎপাদন দৈনিক ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেলের মধ্যে ওঠানামা করেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার উৎপাদন ২০২০ সালের পর থেকে কমে দৈনিক ১ কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি চাহিদাও ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০১০ সালে যেখানে দৈনিক তেলের চাহিদা ছিল ৮ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল, সেখানে গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলে। গত দেড় দশকে বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির বড় অংশই পূরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদন বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালে চার দশকের বেশি সময় ধরে কার্যকর থাকা তেল রফতানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সূচনা করে। সেই সিদ্ধান্তের এক দশকের মধ্যেই দেশটি বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারকে পরিণত হয়েছে।
বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন আধিপত্য ওপেক প্লাস জোটের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে গত মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ওপেকের দীর্ঘ ৬০ বছরের সদস্যপদ ত্যাগ করায় সংস্থাটির প্রভাব নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের শীর্ষ তেল রফতানিকারক হওয়ার ফলে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। বর্তমানে ইউরোপের দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন সরবরাহের ওপর আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি নির্ভরশীল। একই সঙ্গে এশিয়ার অনেক দেশও মধ্যপ্রাচ্যের তেলের বিকল্প হিসেবে মার্কিন তেলের দিকে ঝুঁকছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তেল রফতানির ৪৬ শতাংশই গেছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে নতুন ভারসাম্য তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
