অর্থনীতি বার্তা | অনলাইন ডেস্ক
দেশের অর্থনীতিকে মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে বের করে এনে অংশগ্রহণমূলক ও বহুমাত্রিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে চায় সরকার। শিল্প ও সেবা খাতের পাশাপাশি সৃজনশীল শিল্প, সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং গ্রামীণ কারুশিল্পকে জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বুধবার (৩ জুন) রাজধানীর বনানীর হোটেল সারিনায় তরুণ উদ্যোক্তা নেতাদের সঙ্গে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বা ‘ওভার-রেগুলেশন’-এর মধ্যে আটকে রয়েছে। ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ অর্থনীতির স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। দায়িত্ব গ্রহণের অনেক আগ থেকেই অর্থনীতিতে ডি-রেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে দেশের অর্থনীতি একটি পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছিল। ফলে কিছু সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এসব নিয়ন্ত্রণ সাধারণ উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযোজ্য হলেও প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলো অনেক ক্ষেত্রেই এর বাইরে থেকেছে।
অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে আমীর খসরু বলেন, সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশের প্রতিটি নাগরিককে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সমান সুযোগ দেওয়া এবং উন্নয়নের সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তিনি বলেন, গ্রামীণ কারিগর, কামার, কুমার, তাঁতি ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী পেশাজীবীরা যুগের পর যুগ কাজ করলেও তাদের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও বাস্তবে তারা দীর্ঘদিন মূলধারার বাইরে রয়ে গেছেন।
এ অবস্থার পরিবর্তনে সরকার ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি। তার ভাষায়, থিয়েটার শিল্পী, সংগীতশিল্পী, চিত্রশিল্পীসহ সৃজনশীল পেশাজীবীদের জন্য দেশে কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। অথচ এসব খাত জাতীয় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলোতে সৃজনশীল শিল্প থেকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আয় হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে লোকসংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতির বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি জানান, গ্রামীণ কারুশিল্পীদের জন্য সহজ ঋণ, উৎপাদন সহায়তা, ডিজাইন উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং এবং বাজার সংযোগ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে তারা আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসে সরাসরি নিজেদের পণ্য বিক্রির সুযোগ পাবেন।
‘ওয়ান ভিলেজ, ওয়ান প্রোডাক্ট’ মডেলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মডেলের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশেও এমন উদ্যোগ বাস্তবায়নের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজধানীর আশপাশে একটি ‘ক্রিয়েটিভ ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। সেখানে থিয়েটার, শিল্পকলা, ডিজাইন, সংগীত, স্ট্যান্ড-আপ কমেডি এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের জন্য সমন্বিত অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে, যা নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি করবে।
ক্রীড়াখাতের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখনো স্পোর্টস ইকোনমিকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। অথচ ক্রীড়াও কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জাতীয় আয়ের নতুন উৎস হতে পারে।
তিনি বলেন, অর্থনীতির ভবিষ্যৎ শুধু শিল্প ও প্রচলিত সেবাখাতে সীমাবদ্ধ নয়। সৃজনশীলতা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করেই একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভির গনি এবং বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু। বৈঠকে দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণ ও দ্বিতীয় প্রজন্মের উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনার নানা সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।
