অর্থনীতি বার্তা ডেস্ক
অর্থনীতির বিদ্যমান দুর্বলতা, সরকারের সংস্কার প্রতিশ্রুতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি না করা গেলে রাজস্ব ঘাটতি ও ঋণঝুঁকি বাড়তে পারে।
বাংলানিউজকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বৈদেশিক খাত-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূচক ছাড়া দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সূচকই বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার মতো সূচকগুলোতে দুর্বলতার লক্ষণ স্পষ্ট।
তিনি বলেন, “এই বাস্তবতার মধ্যেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান সরকারের সংস্কার ও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপও বাজেটের ওপর রয়েছে।”
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সতর্কতা
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে বাস্তবে রাজস্ব আহরণ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম হতে পারে।
তার মতে, রাজস্ব প্রাক্কলনের মধ্যেই একটি কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে। প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হলে বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে এবং সরকারকে অতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
রাজস্ব বাড়াতে চার কৌশল
সরকার রাজস্ব আদায় বাড়াতে চারটি প্রধান কৌশল গ্রহণ করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। এগুলো হলো—
- কর ফাঁকি ও অপচয় হ্রাস
- কর ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ডিজিটালাইজেশন
- করের আওতা সম্প্রসারণ
- প্রশাসনিক সংস্কার
তবে এসব উদ্যোগ সফল করতে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই অর্থনীতিবিদ।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন
ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যয় কমানোর পথ বেছে নেওয়া হলে তা ইতিবাচক হবে না। কারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাংলাদেশের আরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে বর্তমান ব্যয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বরাদ্দ বাড়ানো হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
শিল্প ও উদ্যোক্তাদের জন্য ইতিবাচক বার্তা
রপ্তানিমুখী এবং আমদানি বিকল্প শিল্পের বিকাশে বাজেটে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেন মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট, কাস্টমস ডিউটি এবং অগ্রিম আয়কর (এআইটি) যৌক্তিকীকরণের উদ্যোগ বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তা ও স্টার্ট-আপ খাতের জন্য ঘোষিত সুবিধাগুলোও আশাব্যঞ্জক।
বাস্তবায়নই মূল পরীক্ষা
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বাজেটে বেশ কিছু ইতিবাচক নীতি ও উদ্যোগ রয়েছে। তবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নত করা না গেলে এসব উদ্যোগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
তিনি বলেন, “বাজেটের লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জনই হবে আগামী অর্থবছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”
